ন্যায়বিচার সবার জন্য প্রযোজ্য

newsup
  • আপডেট টাইম : February 09 2021, 11:31
  • 521 বার পঠিত
ন্যায়বিচার সবার জন্য প্রযোজ্য

আইনের ফাঁক গলিয়ে এ দেশে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যায় বলে অভিযোগ আছে। অভিযোগ আছে বিনা বিচারে, বিনা অপরাধে জেল খাটারও। বাংলাদেশে প্রধানত দুই ধরনের আইন প্রচলিত। ফৌজদারি এবং দেওয়ানি। এই দুই ধরনের আইনের মধ্যে ফৌজদারি আইনের মামলায় বাদী আসামির শাস্তি দাবি করেন, অন্যদিকে দেওয়ানি আইন অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে থাকে। সাধারণভাবে হত্যা, সন্ত্রাস, হত্যাচেষ্টা, ধর্ষণ এ ধরনের অপরাধের মামলা হয় ফৌজদারি আইনে। আর প্রধানত জমিজমা, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের মামলা হয় দেওয়ানি আইনে। এই দুই ধরনের আইনের মামলা তদন্ত, পরিচালনা আর বিচারের জন্য আছে আরো আইন। সিভিল প্রসিডিউর কোড এবং ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোড। দুই ধরনের আইনের আলাদা নিয়ম, দর্শন রয়েছে। ফৌজদারির ক্ষেত্রে শতভাগ সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে বিচার আদায় করতে হয়। কোনো প্রকার সন্দেহ নিয়ে এই বিচারকার্য সম্পন্ন করা হয় না। তার মানে এখানে আসামির জন্য আলাদা সুবিধা লক্ষণীয়। কেননা শতভাগ সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে সর্বোচ্চ অপরাধের শাস্তিও নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। যার ফলে মামলা স্থগিত হয়ে যায় এবং এভাবে অনেক আসামি পার পেয়ে যাচ্ছে। এখানে প্রচলিত আইনের সংস্করণ জরুরি।

বাংলাদেশে আইনের ফাঁকফোকর হিসেবে যেসব ঘটনার উদাহরণ দেওয়া হয়, সেসব মামলা বা অপরাধ সাধারণত ফৌজদারি আইনের। আর ফৌজদারি আইনে মামলা দায়ের, তদন্ত, বিচার এবং রায় কার্যকর পর্যন্ত অনেক ধাপ আছে। মামলা দায়ের, তদন্ত এবং অভিযোগপত্র এই তিনটি স্তর সঠিকভাবে সম্পন্ন হলেও কেবল পরবর্তীতে ন্যায়বিচার আশা করা যায়। যদি শুরুতেই গলদ থাকে, তাহলে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ন্যায়বিচার শুধু মামলার বাদীর একার নয়, ন্যায়বিচার আসামির জন্যও প্রযোজ্য। তাই শুধু আইন-আদালত নয়, তদন্তকারী সংস্থাও পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। আইন প্রয়োগ এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায়ই আসলে আইনের চরিত্রকে প্রকাশ করে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ বিপদ। এই সংস্কৃতি এক দিনে গড়ে উঠেনি। দীর্ঘদিনের ক্ষমতার অপব্যবহার, ক্ষমতার লোভ, আদর্শিক দ্বন্দ্ব, হিংসাত্মক রাজনীতির চর্চা ছড়াও আরো বেশ কিছু নেতিবাচক কার্যক্রমের চর্চা আজকের এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির রূপ ধারণ করেছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠার কারণে অপরাধীরা আজ বেপরোয়া। তারা আইনকে পরোয়া করছে না। ফলে তারা যেকোনো অপরাধ করতে দ্বিধাবোধ করে না।

এ ছাড়া বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, বিচার বিভাগের দীর্ঘসূত্রতা, জটিলতা বিচারহীনতার জন্য দায়ী। দীর্ঘসূত্রতা সঠিক বিচার পাওয়ার অন্যতম অন্তরায়।

ক্ষমতার আনুগত্য-ন্যায়বিচার সুষ্ঠু বিচার করা মনিবের আনুগত্য নয়, বরং আইনের আনুগত্য, সংবিধানের আনুগত্য। ক্ষমতার আনুগত্য বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠার জন্য বিশেষভাবে দায়ী। বিচারকার্যে হস্তক্ষেপ বিচারকার্যে নানামুখী হস্তক্ষেপের কারণে সুষ্ঠু বিচার পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে; যা বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠার জন্য দায়ী। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, এ দেশে এমনও ঘটনা রয়েছে ফাঁসি কার্যকরের এক দিন আগে ফাঁসির দন্ডের আসামি খালাস হয়। আইনের দুর্বল প্রয়োগ এই যে প্রতিদিন আমাদের চোখের সামনে এত এত ধর্ষণ, হত্যা-লুণ্ঠন চলছে। দেশে এত এত আইন থাকার পরও তা না কমে উল্টো দিন দিন বাড়ছে কেন। তার অন্যতম কারণ আইনের দুর্বল প্রয়োগ। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা মানুষকে বিচারের দ্বারস্থ হতে নিরাশ করছে। ফলে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে, যা মোটেও সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক নয়।

সম্প্রতি আনুশকা ট্র্যাজেডিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, অপরাধী রিহানের বয়স কমিয়ে নানা উপায়ে তাকে নির্দোষ করার পাঁয়তারা চলছে। এই যে অপরাধীকে নির্দোষ করার জন্য এত সব আয়োজন, যা অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী। বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর আইনের যে দুর্বল প্রয়োগ আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে তা রুখে দেওয়ার জন্য বিচারিক কাঠামো সংস্করণ জরুরি এবং বিশেষ করে ফৌজদারি আইনের সব ধাপ যেন স্বচ্ছ এবং অত্যন্ত সুচারু কার্যক্ষমভাবে পরিচালিত হয় একই সঙ্গে কোনো রকমের অনিয়ম যেন না হয়, সেজন্য দেশ, রাষ্ট্র, সরকার ও সাধারণ মানুষসহ সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর