জীবন সর্বাগ্রে, বেঁচে থাকলে সবকিছু গুছিয়ে নিতে পারবঃ প্রধানমন্ত্রী

newsup
  • আপডেট টাইম : April 14 2021, 09:52
  • 504 বার পঠিত
জীবন সর্বাগ্রে, বেঁচে থাকলে সবকিছু গুছিয়ে নিতে পারবঃ প্রধানমন্ত্রী

নিউজ ডেস্কঃ করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর সরকারের নেওয়া কঠোর পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, গত সপ্তাহে দ্বিতীয় ঢেউ প্রবল আকার ধারণ করলে মানুষের চলাচলের ওপর সরকারকে কিছু কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হয়। কিন্তু কোনোভাবেই সংক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না। জনস্থাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে তাই আরও কিছু কঠোর ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, জানি, এর ফলে অনেকেরই জীবন-জীবিকায় অসুবিধা হবে। কিন্তু আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে- মানুষের জীবন সর্বাগ্রে। বেঁচে থাকলে আবার সবকিছু গুছিয়ে নিতে পারব।

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে গণভবন থেকে মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন সরকারপ্রধান।

করোনা মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপের সফলতার প্রত্যাশা করে শেখ হাসিনা বলেন, সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে অবশ্যই এই মহামারিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবো। বাঙালি বীরের জাতি। নানা প্রতিলকূলতা জয় করেই আমরা টিকে আছি। করোনার এই মহামারিও আমরা ইনশাআল্লাহ মোকাবিলা করব। দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনাদের শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সরকার সব সময় আপনাদের পাশে রয়েছে। দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানার পর দরিদ্র-নিম্নবিত্ত মানুষদের সহায়তার জন্য কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছি।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর প্রেক্ষাপটে সরকার ঘোষিত লকডাউনে দেশবাসীকে ঘরে থেকে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ বছরও আমরা বাইরে কোনো অনুষ্ঠান করতে পারছি না। কারণ করোনা নতুন করে আঘাত হেনেছে সারাদেশে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের করোনা আরও মরণঘাতী হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। পহেলা বৈশাখের আনন্দ তাই এবারও ঘরে বসেই উপভোগ করব আমরা। টেলিভিশন চ্যানেলসহ নানা ডিজিটাল মাধ্যমে অনুষ্ঠানমালা প্রচার হবে। সেসব অনুষ্ঠান উপভোগ ছাড়াও আমরা নিজেরা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘরোয়া পরিবেশে আনন্দ উপভোগ করতে পারি।

প্রধানমন্ত্রী করোনা মোকাবিলায় দেশবাসীর প্রতি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে তার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সবাইকে সাবধান হতে হবে। প্রত্যেকের দায়িত্ব নিজের, পরিবারের সদস্যদের এবং প্রতিবেশীর সুরক্ষা দেওয়া। কাজেই ভিড় এড়িয়ে চলুন। বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করুন। ঘরে ফিরে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে গরম পানির ভাপ নিন।

প্রধানমন্ত্রীর এ ভাষণ গতকাল সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ কয়েকটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল একযোগে সম্প্রচার করে। দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর এটিই ছিল জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণ। গত বছরের মার্চে দেশজুড়ে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকেই বিভিন্ন সময় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে আসছেন তিনি।

ভাষণের শুরুতে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত বাঙালিকে ১৪২৮ বঙ্গাব্দের শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আবাহনের দিন। ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো/মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী এই গান গেয়ে আজ আমরা আবাহন করব নতুন বছরকে। একই সঙ্গে শুরু হয়েছে মুসলমানদের পবিত্র সিয়াম সাধনার মাস মাহে রমজান। সব ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে পবিত্র মাহে রমজানের মোবারকবাদ জানাচ্ছি। করোনায় মারা যাওয়া সবার রুহের মাগফিরাত ও আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি স্বজনহারা পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী।

বাংলা নববর্ষ ও পহেলা বৈশাখ উদযাপনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, কালক্রমে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান এখন শুধু আনন্দ-উল্লাসের উৎসব নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির একটি শক্তিশালী ধারক-বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পহেলা বৈশাখ আমাদের সব সংকীর্ণতা, কূপমণ্ডূকতা পরিহার করে উদারনৈতিক জীবন ব্যবস্থা গড়তে উদ্বুদ্ধ করে। আমাদের মনের ভেতরের সব ক্লেদ, জীর্ণতা দূর করে নতুন উদ্যমে বাঁচার অনুপ্রেরণা দেয়।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আজ শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের যে প্রান্তেই বাঙালি জনগোষ্ঠী বসবাস করেন, সেখানেই বাঙালির হাজার বছরের লোকসংস্কৃতির বিস্তার ঘটছে বর্ষবরণসহ নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। তিনি বলেন, অতীতের সব জঞ্জাল-গ্লানি ধুয়ে-মুছে আমরা নিজেদের পরিশুদ্ধ করব। দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে যাব সামনের দিকে। গড়ব আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ- এই হোক এবারের নতুন বছরের শপথ। কবিগুরুর ভাষায় আবারও বলতে চাই- নিশি অবসান প্রায় ওই পুরাতন বর্ষ হয় গত/আমি আজ ধূলিতলে জীর্ণ জীবন করিলাম নত।/বন্ধু হও, শত্রু হও, যেখানে যে রও/ক্ষমা কর আজিকার মতো/পুরাতন বরষের সাথে পুরাতন অপরাধ যতো।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া যায়নি। বিদেশের সঙ্গে চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। এ অবস্থা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের যেখানেই এই মরণঘাতী ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ছে, সেখানেই এ ধরনের ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, মানুষের জীবন রক্ষার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকা যাতে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে না পড়ে, সেদিকে সরকার কঠোর দৃষ্টি রাখছে।

শেখ হাসিনা বলেন, করোনার কারণে অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় গত বছর সরকার চারটি মূল কার্যক্রম নির্ধারণ করেছিল। এই চার মূলনীতির ভিত্তিতে কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে। কলকারখানায় যাতে উৎপাদন ব্যাহত না হয় সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নানা শ্রেণিপেশার মানুষকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

করোনা মোকাবিলায় দেশের মানুষের টিকা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সৌভাগ্য, টিকা উৎপাদনের শুরুতেই সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টিকার ডোজ নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সবাইকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, টিকা দিলেই একজন সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত হবেন- এমন নিশ্চয়তা নেই বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। কাজেই টিকা নেওয়ার পরও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

তিনি বলেন, ঢাকাসহ প্রতিটি জেলায় করোনা রোগীর চিকিৎসা সুবিধার আওতা আরও বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বিদ্যমান আইসিইউ সুবিধা আরও বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুগে যুগে মহামারি আসে, আসে নানা ঝড়-ঝঞ্ঝা, দুর্যোগ-দুর্বিপাক। এসব মোকাবিলা করেই মানবজাতিকে টিকে থাকতে হয়। জীবনের চলার পথ মসৃণ নয়। তবে পথ যত কঠিনই হোক, সেটাকে জয় করেই এগিয়ে যেতে হবে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় তাই বলতে চাই- ‘আমরা চলিব পশ্চাতে ফেলি পচা অতীত, গিরি-গুহা ছাড়ি খোলা প্রান্তরে গাহিব গীত। সৃজিব জগৎ বিচিত্রতর, বীর্যবান, তাজা জীবন্ত সে নব সৃষ্টি শ্রম-মহান।’ নতুন বছরে মহান আল্লাহর দরবারে তাই প্রার্থনা, বিশ্বকে এই মহামারির হাত থেকে রক্ষা করুন।

শেখ হাসিনা বলেন, অতীতের সকল জঞ্জাল-গ্লানি ধুয়ে-মুছে আমরা নিজেদের পরিশুদ্ধ করবো। দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে যাবো সামনের দিকে। গড়বো আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যত- এই হোক এবারের নতুন বছরের শপথ।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কবিগুরুর কবিতা উদ্ধৃত করে বলেন, নিশি অবসান, ওই পুরাতন/ বর্ষ হলো গত/ আমি আজ ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন
করিলাম নত।/ বন্ধু হও, শত্র হও, যেখানে যে কেহ রও/ ক্ষমা করা আজিকার মতো/ পুরাতনের বছরের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যতো।

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর