মৃত্যুহীন বঙ্গবন্ধু : রেণুর কাছ থেকে

newsup
  • আপডেট টাইম : August 15 2021, 11:57
  • 516 বার পঠিত
মৃত্যুহীন বঙ্গবন্ধু : রেণুর কাছ থেকে
নিউজ ডেস্কঃ যত সহযোগিতা পেয়েছেন, সেটা ছিল তার কর্মের একটি বড় ধরনের উত্সাহের জায়গা, শক্তির জায়গা। সেই শক্তিকে ধারণ করে তিনি স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতির পিতা হয়েছেন।

১৫ আগস্ট বাঙালির জীবনে এক অবিনাশী সত্যের দিন। এই দিনে আমাদের প্রাণপ্রিয় মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তার শারীরিক মৃত্যু ঘটেছে, কিন্তু তিনি বাঙালির ইতিহাসে একজন অমর মানুষ, সেই অর্থে তিনি মৃত্যুহীন মানুষ। তার আদর্শ এবং তার দর্শনের জায়গা ধরে তিনি যেভাবে বাঙালিকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যেভাবে বাঙালির জন্য একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, এটি বিশ্বের ইতিহাসে একটি অনন্য ব্যাপার। এই দিক থেকে তাকে শারীরিকভাবে মৃত মানুষ বলে মনে করতে পারি, কিন্তু তিনি আমাদের মাঝে সেই অমর মানুষ, যার আদর্শ এবং চিন্তা-চেতনাগত বিন্যাস হাজার হাজার বছরের সামনের বাংলাদেশকে তুলে ধরবে—এই বিন্যাসে বিকশিত হবে আগামীর প্রজন্ম।

 

মৃত্যুহীন বঙ্গবন্ধু

 

আমি সব সময় বলি আগস্টের এই দিন আমাদের শোক ও শক্তির উত্স। শোক আছে, তাকে হারানোর বেদনা আছে, সেই সঙ্গে শক্তিও আছে। তার আদর্শ এবং দর্শন চিন্তায় এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিয়ে রাষ্ট্রকে সোনার বাংলায় পরিণত করার একটি দিকদর্শন। সবকিছু মিলিয়ে ১৫ আগস্ট এই অর্থে একটি শক্তির জায়গা। সেই শক্তি দিয়ে বাঙালি যদি এগিয়ে যায় তবে বিশ্বের দরবারে পৌঁছাতে কোনো সময় লাগবে না, এই সময় না-লাগাটা হবে বঙ্গবন্ধুর অমরত্বের সাধনার একটি বড় দিক। আমরা তাকে হারিয়েছি কিছু নষ্ট মানুষ, কিছু অন্যায় সাধনকারী মানুষ যারা এই পৃথিবী থেকে তাকে সরিয়েছে, তারা যে ভুলটা করেছে, তারা যে অন্যায় সংঘটিত করেছে—তার কোনো ক্ষমা নেই। ক্ষমা হয় না। তিনি আমাদের জীবনকে আলোকিত করে আরো দূরদর্শী পথে এগিয়ে নিয়ে যেতেন। তিনি বেঁচে থাকলে আমরা সোনার বাংলা পেতাম, আমরা বাঙালির মানস গঠনের ভেতর চেতনার জাগরণ পেতাম। সেই চেতনার জাগ্রত শক্তি দিয়ে বাঙালি বিশ্বকে আলোকিত করতে পারত।

১৯৭৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন, এটি তার একটি অসাধারণ দিক, তিনি নিজের মাতৃভাষাকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এভাবে আমরা এগোতে পারতাম এবং এভাবে আমাদেরকে তিনি আরো দূরদর্শী জায়গায় পৌঁছে দিতে পারতেন, যে জায়গা থেকে বাঙালি পেছন ফিরে তাকাত না, সামনে এগিয়ে যাওয়ার জায়গাটা তৈরি হতো তাদের চিন্তায়। এখন যেভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সেই ধারাটাকে আরো বৃহত্ভাবে সমুন্নত করে তিনি যদি তার পিতার দিকদর্শনের জায়গাটকে ধারণ করে বাঙালির বড় যাত্রাকে অব্যাহত রাখতে পারেন, আমরা মনে করব বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং চেতনাগত দিক আমাদের জীবনকে পরিপূর্ণ করেছে, প্রসারিত করেছে। আমরা সেই প্রসারিত জীবনের মাঝে নিজেদেরকে বড় মাত্রায় আবিষ্কার করে একদিকে যেমন দেশ গঠন এবং উন্নয়নের ধারায় নিজেদেরকে আলোকিত করতে পারব, অন্যদিকে তেমনি শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র ইত্যাদির মাধ্যমে আমাদের সবকিছু বিশ্বের মানুষের সামনে পৌঁছাবে, বিশ্বের পাঠক আমাদের অনুবাদ বই পড়বে, বিশ্বের দর্শক আমাদের চলচ্চিত্র দেখবে, আমাদের চিত্রশিল্পীদের শিল্প দেখবে এবং এই সব কিছু মিলিয়ে আমাদের সংগীতের ধারাকে উজ্জীবিত করে আমরা বাংলা ও বাঙালিকে বিশ্বের দরবারে নানাভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারতাম। সে জায়গাটা আমাদের বন্ধ হয়ে গেছে বলব না, সেই জায়গাটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবং এই ক্ষতিকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার দিকটা যদি আলোকিত করা যায়, তবে মনে হবে ১৫ আগস্ট আমাদের সেই শক্তির চেতনাকে জাগ্রত করেছে, যে শক্তির চেতনা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা নির্মাণে আমরা ব্রতী হয়েছি, আমরা ব্রতী হতে চাই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা নির্মাণে এবং সেই ব্রতী হওয়ার চেতনা যিনি রাষ্ট্র-ক্ষমতায় থাকবেন তিনি যদি অবারিত করেন, একটা সুযোগ তৈরি করে দেন, তবে বুঝতে হবে বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে অমর মানুষ হয়ে বেঁচে আছেন। তাকে ধারণ করে আমরা নিজেদের গৌরবকে সমুন্নত করেছি। আমাদের দেখায় বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব এক অসাধারণ মানুষ।

তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চেতনার পাশাপাশি যেভাবে সহযোদ্ধার ভূমিকা পালন করেছেন, সেটা ছিল একটি রাজনৈতিক জ্ঞানের দিকদর্শন। আমরা যে কেউ এভাবে পারস্পরিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ভালোবাসার মৌন জায়গাটাকে প্রসারিত করতে পারি। বঙ্গমাতা যেভাবে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনকে নিজের সবটুকু কর্মের মাঝে ধারণ করে তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছেন, এটি হলো বাঙালির জন্য একটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত। তিনি কখনো বঙ্গবন্ধুকে তার কর্মক্ষেত্র থেকে পেছনে টানেননি, বরং তার এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রটিকে প্রসারিত করে তাকে এগিয়ে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছেন, রেণু যদি আমার এই সবকিছু দেখাশোনা না করত, আমার কারাগারের জীবন, আমার ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করে, আমার সমস্ত অভাব-অনটনকে দূর করে আমাকে এগিয়ে না দিত, তবে আমি হয়তো ভবিষ্যতের বঙ্গবন্ধু হতে পারতাম না। এইভাবে নিজের জীবনসঙ্গীকে স্বীকার করে বঙ্গবন্ধু আমাদের সামনে একটি নতুন মাত্রাবোধের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

রেণুর কাছ থেকে যত সহযোগিতা পেয়েছেন, সেটা ছিল তার কর্মের একটি বড় ধরনের উত্সাহের জায়গা, শক্তির জায়গা। সেই শক্তিকে ধারণ করে তিনি স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতির পিতা হয়েছেন। বঙ্গমাতা আমাদের সামনে যেইভাবে আলোকিত মানুষ হিসেবে দেখা দিয়েছেন, সেই আলোকিত মানুষের দ্বারা আরেক জন মানুষ এগিয়ে যেতে পারে। এইটা যে কোনো ছোটখাটো ক্ষেত্রেও যদি কোনো মানুষ কাজ করে, সেটা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সবার জন্য হতে পারে। একজন নারী যদি এগিয়ে যায়, তার ভালোবাসার মানুষ যদি তাকে পথ দেখায়, তার পথের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে তাকে এগিয়ে দেওয়ার জায়গাটা বড় করে তোলে, তবে সব ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী এই নারী আমাদের সামনে একজন অসামান্য মানুষ। ৮ আগস্ট তার জন্ম দিন, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই সঙ্গে তার মৃত্যু দিন। আগস্টের এই জন্ম ও মৃত্যু, বঙ্গমাতা আমাদের সামনে একটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত হয়ে অমর হয়ে থাকবেন।
এই ক্যাটাগরীর আরো খবর