কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনের মতো ডিজিটাল সামগ্রীকে ঘিরে এই জগত তৈরি করেছি আমরা। আমাদের চারপাশের ভৌত বাস্তব পৃথিবীতে নয়, এর অবস্থান এক সমান্তরাল ভার্চুয়াল বা অপার্থিব জগতে। খবর বিবিসির।

ভার্চুয়াল এই জগত পরিচালনা করার মূলে যা রয়েছে তা হচ্ছে গাণিতিক কিছু নির্দেশনা, কম্পিউটারের পরিভাষায় যাকে বলা হয় অ্যালগরিদম।

এই অ্যালগরিদমই ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপের মতো সোশাল মিডিয়া এবং গুগলের মতো সার্চ ইঞ্জিনকে নিয়ন্ত্রণ করে।

অ্যালগরিদম কী

অ্যালগরিদম হচ্ছে যে কোনো কাজের প্রণালী বা ধাপে ধাপে কোন কিছু করার প্রক্রিয়া। রন্ধনপ্রণালীর সঙ্গে এর তুলনা দিয়ে এটি সহজে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। ভাত রান্না করার সময় প্রথমে একটি পাত্রে চাল নেওয়া হয়, তার পর তাতে পানি ঢালা হয়, চাল কয়েকবার ধোওয়ার পর সেটি রাখা হয় চুলার ওপরে, তার পর চুলা জ্বালাতে হয়- এই প্রক্রিয়াটিই অ্যালগরিদম।

“কম্পিউটার নিজে কোন কাজ করতে পারে না। তবে তার রয়েছে নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা। তাকে কিছু পদ্ধতি বলে দেওয়া হয় যাতে সে তার খুব কম বুদ্ধি দিয়ে (কিম্বা তার কোন বুদ্ধি নেই) কাজটা সম্পাদন করতে পারে। প্রক্রিয়াগুলো সূক্ষ্ম ও সরলভাবে দেওয়া থাকে যেন কাজটা সে কিছু গাণিতিক ধাপের মাধ্যমে শেষ করতে পারে। এসব নির্দেশনাই অ্যালগরিদম,” বলেন মি. মাহ্‌মুদ।

সোশ্যাল মিডিয়ায় কীভাবে কাজ করে

সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যালগরিদমের ব্যবহার নিয়ে সম্প্রতি অনেক আলোচনা হচ্ছে। কারণ এসব মিডিয়াতে মানুষ কোন খবর দেখতে পাবেন বা পাবেন না সেটা এই অ্যালগরিদমের মাধ্যমেই নির্ধারিত হচ্ছে।

নাসিম মাহ্‌মুদ বলেন, “অ্যালগরিদম এখন অনেক দূর এগিয়েছে, অ্যালগরিদম অনেক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেসব সিদ্ধান্ত নিয়েই আমরা চলছি।”

মি. মাহ্‌মুদ বলেন, “ধরা যাক ফেসবুকে আপনার যিনি বন্ধু, তার বন্ধুরাও আপনার বন্ধু হতে পারে। অ্যালগরিদমকে বলা হলো একজন ব্যক্তির যে বন্ধু রয়েছে, তার যারা বন্ধু, তাদেরকে তুমি বলো যে তারাও তার বন্ধু হতে পারে। কিন্তু ধরা যাক যিনি অ্যালগরিদম ডিজাইন করেছেন তার হয়তো জানা ছিল না যে চাকরির সূত্রে, কিম্বা একই পাড়ায় থাকার কারণে, অথবা একই স্কুলে পড়ার কারণেও বন্ধু হতে পারে।”

তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়াটি ক্রমাগতই আপডেট করা হচ্ছে যার ফলে সময়ের সাথে অ্যালগরিদমও আরো সমৃদ্ধ হচ্ছে। ফলে অ্যালগরিদম নাকি মানুষ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে -সেটি স্পষ্ট করে বলা কঠিন। অ্যালগরিদম সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের করা ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করেই অ্যালগরিদম তার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।

“মানুষ যে বিষয়গুলো সহজে হিসাব করতে পারছে না অ্যালগরিদম সেই কাজটা দ্রুত করে দিতে পারছে। যেমন এক ব্যক্তি এক লক্ষ মানুষ থেকে তার বন্ধুকে খুঁজে বের করতে পারে না। কিন্তু অ্যালগরিদম মুহূর্তের মধ্যেই সেটা করতে পারছে।”

তবে বর্তমানে এমনভাবে অ্যালগরিদম ডিজাইন করা হচ্ছে যাতে কম্পিউটার নিজেও সময়ের সাথে সাথে ডিজাইনার ছাড়াই নতুন নতুন বিষয় শিখতে পারছে। তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমেই এটা সম্ভব হচ্ছে যাকে বলা হয় মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং কিম্বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

অ্যালগরিদম যখন নতুন কোন তথ্য পায় তা থেকেও সে শিখতে পারে। কারণ কিভাবে শিখতে হবে এটাও তাকে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে।

“একটা ছোট্ট শিশুকে প্রথমে আমরা কিছু শব্দ শিখিয়ে দেই, তার পর সে নিজে নিজেও কিছু শব্দ শিখতে পারে, এসময় হয়তো ভুলও করে, তখন আমরা তাকে ঠিক করে দেই, আবার সে ভুল করে- অ্যালগরিদমকে এভাবেও ভাবা যায়,” বলেন নাসিম মাহ্‌মুদ।

মানুষ কী অ্যালগরিদমের খাঁচায় বন্দী

অ্যালগরিদমের নেটওয়ার্ক এখন এতো বেশি বিস্তৃত, আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে গাণিতিক এসব নির্দেশনাই যেন মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে।

একজন ব্যক্তি কী করেন, কখন কোথায় থাকেন, কী খেতে পছন্দ করেন, তার সামাজিক মর্যাদা কী, তিনি কোন ফুটবল ক্লাবকে সমর্থন করেন- তার সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার থেকে অ্যালগরিদম এসব কিছু জেনে যায়।

নাসিম মাহ্‌মুদ বলেন, “আমরা কীভাবে ভাবছি, এবং কীভাবে ভাববো, এই বিষয়গুলোও মনে হচ্ছে কেউ ডিজাইন করে দিচ্ছে। আমি কোন খবরটা দেখবো এবং কোনটা দেখবো না সেই সিদ্ধান্তও হয়তো অন্য কেউ নিচ্ছে।”

ফেসবুকে কেউ যদি কোন থ্রিলার বই-এর খোঁজ করেন এর পর থেকে ফেসবুক তাকে থ্রিলার বই-এর খবর পাঠাতে থাকবে। এবং তিনি শুধু এধরনের বই-ই পড়তে থাকবেন।

ভয়টা এখানেই- তিনি হয়তো জানতেও পারবেন না যে থ্রিলারের বাইরেও রোমান্টিক ও অ্যাডভেঞ্চার ধরনের বই রয়ে গেছে।

তবে সুখবর হচ্ছে যারা অ্যালগরিদমের ডিজাইন করছেন তারা এখন সোশাল মিডিয়াকে এধরনের বাবল বা বৃত্তের ভেতর থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছেন।